যখনই নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে তখনই নারীর উপর দায় চাপানো হয়, নারীকে ঘরে থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। শক্তি নামের সংগঠনের নারীরা বলেন, কেনো আমরা ঘরে থাকব? এটা তো আমারও শহর!
নারীদের এই সংগঠনের কর্মকৌশল ছড়িয়ে আছে শহরের রাস্তায়, পাড়ায় বা মহল্লায়।
- ‘ আমি পথে নামি জীবিকার প্রয়োজনে, উৎসবের আয়োজনে, কারও মনোরঞ্জন করতে না’— এই স্লোগানের পোস্টার ইদানিং দেখা যাচ্ছে ঢাকার বিভিন্ন এলাকার দেওয়ালে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, বাসের গায়ে। এই পোস্টারের পেছনে রয়েছে শক্তি নেটওয়ার্ক।কেনো এই পোস্টার আর তারাই বা কারা এটাই জানান তারা।শক্তি কী?শক্তি মেয়েদের এলাকা ভিত্তিক একটি বন্ধুত্বের নেটওয়ার্ক। ফেইসবুকের মাধ্যমে একই এলাকার মেয়েদের নিজেদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ আর সশরীরে পরিচয় ঘটিয়ে দিয়ে বন্ধুত্ব তৈরি করার জন্য কাজ করছেন তারা। এলাকার মেয়েরা ছোট ছোট গ্রুপ তৈরি করে নিজেরা আড্ডা দেয়, একসঙ্গে বেড়ায়, কাজে বের হয়। মোট কথা একসঙ্গে থাকে যেন কোনো বিপদে, প্রয়োজনে তারা একা না হয়ে পড়ে।ঢাকার বিভিন্ন এলাকার গ্রুপগুলোর মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করা হয় যেন অন্য এলাকায় গিয়ে কোনো মেয়ে বিপদে পড়লে তার পাশে দাঁড়ানোর বন্ধু থাকে। এইভাবেই ছড়িয়ে যাচ্ছে নেটওয়ার্কটি।কেনো শক্তি?
শক্তির পরিকল্পনাকারী ফারহিন কবির বলেন, “আমাদের দেশে মেয়ের সবসমই এটা করবে না ওটা করবে না বলে ঘরেই থাকতে বলা হয়। ভাবটা এমন বের না হলে মেয়ে নিরাপদ। তাই মেয়েদের বন্ধুও কম হয়। একই পাড়ায় থেকেও কোনো বিপদে পড়া মেয়ের পাশে এসে কেউ দাঁড়ায় না। কারণ মেয়েটাকে কেউ হয়ত চিনেই না।”তিনি আরও বলেন “আমাদের সমাজে মেয়েদের বন্ধুত্ব স্থাপনের একমাত্র উপায় হচ্ছে প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক বন্ধুত্ব। এমনিতেও মেয়েদের বন্ধু কম হবে তাই ধরে নেওয়া হয়। তাই পথে ঘাটে আপত্তিকর মন্তব্য, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ, নির্যাতনজাতীয় সমস্যা তারা মোকাবেলা করার মতো সাহস জুটিয়ে উঠতে পারে না। একতার শক্তি ব্যবহার করে মেয়েরা তাদের সমস্যার সমাধান নিজ এলাকায় এবং অন্য এলাকাতেও করতে পারবে এই বিশ্বাস থেকে গত বছর পহেলা বৈশাখে ঐক্যবদ্ধভাবে নারী নির্যাতনের ঘটনার প্রেক্ষিতে ১৭ এপ্রিল গঠণ করা হয় শক্তি।”“নারীদের লাইফস্টাইলে একটি পরিবর্তন আনছে শক্তি। এখন আর নারীরা একা নয়, ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তার অনেক গুলো বন্ধু” বললেন খিলগাঁও শক্তির কো-অর্ডিনেটর এবং একটি প্রকাশনা সংস্থার কর্ণাধার রুমানা শারমিন।শক্তিরা কী করে?“শক্তিতে আমরা আসলে খুব কঠিন কিছু করি না। আমরা পথে বসে আড্ডা দেই, খাইদাই, গল্প করি, এভাবে পথে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করি।” বললেন নাজনীন ফাতেমা। পেশায় তিনি একজন পুরকৌশলী।
“এটা খুব মজার! কারণ আমরা এতদিন শুধু জেনে এসেছি পথ আমাদের জন্য অনিরাপদ। তবে দলেবলে আমরা যখন পথে বসে থাকি পথকে মোটেই অনিরাপদ মনে হয় না।” আরও বললেন তিনি।নাজনীনের সঙ্গে সুর মিলিয়ে ইস্কাটন শক্তির কো অর্ডিনেটর নূর-ই-রয়হান বলেন, “আমরা পথে বসে যে শুধু পথের অধিকার প্রতিষ্ঠা করি তাই নয়। আমরা পথকে নারীর জন্য আরও কীভাবে নিরাপদ করা যাবে সেসব নিয়ে কাজ করি। বাইরে থেকে আমাদের শুধু আড্ডা দিতেই দেখা যায়। তবে আমাদের সব কাজ একটা টিম করে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, আমাদের নিজস্ব আচরণবিধি আছে এবং প্রতিটি এলাকায় এইসব নিয়ম মেনে পরিচালনা করার জন্য রয়েছে একজন করে গ্রুপ কো-অর্ডিনেটর ও মডারেটর।”আরও আছে, প্রতিটি এলাকা ভিত্তিক একটা ‘শক্তি ডেটাবেইজ’ যেখানে এলাকার সব ধরনের তথ্য রাখা হয়। তারা অফ লাইনের পাশাপাশি অন লাইনেও নারীদের প্রতি কোনো বৈষম্যমূলক আচরণ বা হয়রানী দেখলে সবাই মিলে রুখে দাড়ায়, এই কার্যক্রমের নাম ‘সাইবার শক্তি’।“শক্তির সাইকেল নামে আমাদের একটি কার্যক্রম আছে যেখানে মেয়েদের বাইসাইকেল শিক্ষার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষকেরা সামান্য অর্থের বিনিময়ে বাইসাইকেল চালানোর শিক্ষা দেন। এটা আমাদের আত্মরক্ষা কার্যক্রমের একটা অংশও বটে।” বললেন নূর-ই-রয়হান।ধানমণ্ডির গ্রুপ কোঅর্ডিনেটর নুশরাত ফারহানা সেই সঙ্গে যোগ করেন, “নারীর জন্য সমাজকে নিরাপদ করতে শক্তি নেটওয়ার্কের কৌশল তিনটি। সকল বৈষম্য ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে নিরবতার অবসান, শক্তির সদস্যদের বিভিন্ন সামর্থ্য ও দক্ষতা বৃদ্ধি, আর সকল এলাকার নারীদের নিজেদের মধ্যে এবং বিভিন্ন নারীবান্ধব সংগঠনের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি করা”
শক্তির মেয়েদের সেলফ ডিফেন্স শেখাচ্ছে মিক্সড মার্শাল আর্ট জিম কেও ফাইট স্টুডিও, কান পেতে রই নামের মানসিক সেবাদানকারী হেল্পলাইন শক্তিদের শেখাচ্ছে ‘ননজাজমেন্টাল’ হতে, আর শক্তির ঢাকাভিত্তিক এই উদ্যোগ পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার মেয়েদের জন্য ব্যবহার করতে কাজ করছে SPaRC।“মেয়েদের শিশুকাল থেকেই সব রকমের পরিস্থিতি মেনে নেওয়ার, নতি স্বীকার করার একটা মানসিকতার মধ্যে বড় করা হয়। যদিও দোষ অন্য কারও তারপরেও দোষ গিয়ে পরে মেয়ের উপর। তারা কখনই নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে বলে উঠতে পারে না, নিজের অধিকার চাওয়া তো অনেক দূরের বিষয়।” বললেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণসংযোগ বিভাগের প্রাক্তন ছাত্রী তাসনীম নুরীন ব্রতী।বর্তমানে একটি অ্যাডভার্টাইজিং এজেন্সিতে কর্মরত ব্রতী আরও বলেন, “এই সমস্যার সমাপ্তি ঘটাতে কালারস এফএম ১০১.৬ এবং শক্তি নেটওয়ার্কের যৌথ উদ্যোগে শুরু হয় রেডিও শো ‘হাত বাড়ালেই শক্তি’। এটি প্রতি রবিবার রাত ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত চলে। বাংলাদেশে সর্বপ্রথম মেয়েদের নিয়ে, মেয়েদের অংশগ্রহণে এবং মেয়েদের জন্য এই শো।”একসময় ব্রতী রেডিও চ্যানেল কালারস এফএম এ কর্মরত ছিলেন।এই বিষয়ে ফারহিন কবির বলেন, “১৪ এপ্রিল, ২০১৫তে প্রকাশ্যে নারীদের সঙ্গে অন্যায় আচরণের পরপর একটি বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠির বক্তব্য ছিল 'নারীরা পথে বের হন অন্যের মনোরঞ্জনের জন্য, কাজেই এই আক্রমণের জন্য দায়ী তাঁরা নিজেরাই!' অথচ আজকের যুগে সবারই পথে নামাটা জরুরি, মানুষ হিসেবে জীবিকার প্রয়োজন, উৎসবের আয়োজনে অংশ নেবার অধিকার তাঁদের এক বিন্দু কম নয়। এই কথাটাই আমরা সবার মাথায় গেঁথে দিতে চাই। তাই পহেলা বৈশাখ উপলক্ষ্যে পোস্টার লাগানো হয়েছে সারা শহর জুড়ে। এই পোস্টারের অর্থায়ন, ডিজাইন থেকে শুরু করে রাতে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন এলাকায় লাগানো পর্যন্ত সব কাজ করেছে বিভিন্ন শক্তি গ্রুপের মেয়েরা।”“আমরা বলতে চাই, নারীর বিরুদ্ধে বৈষম্য আর নির্যাতনের বিরুদ্ধে নারীই একতাবদ্ধ হবে। প্রয়োজন শুধু সবার সহযোগিতা আর সমর্থনের” যোগ করেন ফারহিন।পোস্টার ক্যাম্পেইনের সারা পড়তে সময় নেয়নি। যখন মেয়েরা ঘুরে ঘুরে পোস্টার লাগাচ্ছিল তখন অনেকে সংগঠন, উদ্দেশ্য সম্পর্ক জানতে চান। সেখানেই অনেকে পক্ষে বিপক্ষে মত প্রকাশ করেন। নিজেদের মধ্যে তর্ক করেন। শহরে মেয়েদের চলাফেরার বিষয়টা যত আলোচনায় আসবে ততই সুযোগও বৃদ্ধি পাবে। এমনই মতামত ফারহিনের।
ভবিষ্যত পরিকল্পনা কী?“শক্তির ভবিষ্যত পরিকল্পনা হল নেটওয়ার্ক বৃদ্ধির মাধ্যমে আরও শক্তিশালী হওয়া”, বললেন রুমানা শারমিন।এলাকায় এলাকায় সেলফ ডিফেন্সের কোর্স শুরু করা হবে। এ ছাড়াও পথের উপর নিজের অধিকার স্থাপন চলতেই থাকবে। যতদিন না মেয়েরাও একইভাবে পথে নামবে, নিজের অধিকার বুঝে নিবে ততদিন এইসব বৈষম্য, নির্যাতন চলতেই থাকবে। তাই যত দ্রুত মেয়েরা এই অধিকার বুঝে নিতে পারে তত সব পক্ষের জন্য মঙ্গলকর।ইচ্ছা থাকা সত্বেও এখন পর্যন্ত ঢাকার বাইরে শক্তির কোনো গ্রুপ তৈরি হয়নি। ঢাকাতে এখন পর্যন্ত শান্তিনগর, মালিবাগ, মৌচাক, সিদ্ধেশ্বরী, পল্টন, মগবাজার, ইস্কাটন, বাংলামটর, ফার্মগেট, কল্যাণপুর, মিরপুর, মোহাম্মাদপুর, লালমাটিয়া, ধানমণ্ডি, খিলগা, কমলাপুর, খিলক্ষেত, উত্তরা এই কয়টি এলাকায় শক্তির গ্রুপ রয়েছে।রীদের এই সংগঠনের কর্মকৌশল ছড়িয়ে আছে শহরের রাস্তায়, পাড়ায় বা মহল্লায়।
শেয়ার করুন
